ফয়সাল আহম্মেদ, উপকূলীয় অঞ্চল প্রতিনিধি, শ্যামনগর:
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন ১২ নং গাবুরার ৯ নং সোরা গ্রামে গবাদিপশুর রোগ প্রতিরোধ ও প্রাণিসম্পদ সুরক্ষায় বিনামূল্যে টিকাদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। গরুর ক্ষুরা রোগ এবং ছাগল-ভেড়ার পিপিআর রোগ প্রতিরোধে স্থানীয় খামারি ও পশুপালকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন পশুকে বিনামূল্যে টিকা প্রদান করা হয়।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট ২০২৬) আয়োজিত এ কর্মসূচি Climate Action at Local Level (CALL) প্রকল্পের আওতায়, Global Alliance for Improved Nutrition (GAIN)-এর অর্থায়নে এবং Local Environment Development and Agricultural Research Society (LEDARS)-এর বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত হয়।
উপকূলীয় জনপদ শ্যামনগরের মানুষের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রাণিসম্পদ। বিশেষ করে গাবুরা ইউনিয়নের মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় গবাদিপশু ও ছাগল-ভেড়া অনেক পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস।
এসব প্রাণী বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হলে একদিকে যেমন খামারিদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, অন্যদিকে পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ বাস্তবতায় স্থানীয় পর্যায়ে বিনামূল্যে টিকাদান কর্মসূচি খামারি ও পশুপালকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কর্মসূচিতে স্থানীয় খামারি ও পশুপালকদের গবাদিপশুর রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদানের গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করা হয়। একই সঙ্গে রোগের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত প্রাণিসম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আক্রান্ত পশুকে অন্য পশু থেকে আলাদা রাখার বিষয়ে সচেতন করা হয়।
টিকাদান কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন মোঃ রবিউল ইসলাম, প্রাণিসম্পদ এআই টেকনিশিয়ান,গাবুরা ইউনিয়ন এবং মোঃ শাহানুর আলম, ভ্যাকসিনেটর, গাবুরা ইউনিয়ন। এছাড়া স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, খামারি ও পশুপালকরা কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় CALL প্রকল্পের শ্যামনগর শাখা অফিসের ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর অনুপ কুমার মন্ডল উপস্থিত থেকে কর্মসূচির সার্বিক সহযোগিতা ও সমন্বয় করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গরুর ক্ষুরা রোগ একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। একইভাবে ছাগল ও ভেড়ার পিপিআর রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পশুর মধ্যে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারে। সময়মতো টিকা প্রদান, আক্রান্ত পশুকে পৃথক রাখা, খামারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করলে এসব রোগের বিস্তার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
বক্তারা আরও বলেন, শুধু রোগ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসা করার চেয়ে রোগ প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ বেশি কার্যকর। তাই পশুপালকদের নিয়মিত টিকাদানের আওতায় আসতে হবে এবং গবাদিপশুর স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন হতে হবে। কোনো পশুর মধ্যে রোগের লক্ষণ দেখা দিলে নিজের মতো করে চিকিৎসা না করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
স্থানীয় খামারি ও পশুপালকরা বলেন, প্রত্যন্ত এলাকায় বিনামূল্যে টিকাদানের সুযোগ পাওয়ায় তারা উপকৃত হয়েছেন। অনেক সময় অর্থের অভাব, দূরত্ব কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতির কারণে সময়মতো পশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হয় না।
এ ধরনের কর্মসূচি নিয়মিত আয়োজন করা হলে একদিকে পশুর রোগবালাই কমবে, অন্যদিকে খামারিদের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে মানুষের জীবন-জীবিকা ক্রমেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রাণিসম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও খাদ্য-পুষ্টিনিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রাণিসম্পদ রক্ষায় টিকাদানের পাশাপাশি খামারি প্রশিক্ষণ, সচেতনতা কার্যক্রম এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
স্থানীয় পর্যায়ে লিডার্সের উদ্যোগে আয়োজিত এ বিনামূল্যে টিকাদান কর্মসূচি খামারি ও পশুপালকদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি গবাদিপশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন আয়োজক ও সংশ্লিষ্টদের কাছে । ভবিষ্যতে গাবুরাসহ শ্যামনগরের অন্যান্য প্রত্যন্ত এলাকায় এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান বক্তারা।