শ্যামনগর প্রতিনিধি:
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কালিঞ্চী গ্রামে বাগদা চিংড়ি চাষে টানা এক দশক ধরে চরম ধস নেমেছে। আশানুরূপ উৎপাদন না পাওয়ায় প্রান্তিক ঘের মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা চরম আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, বর্তমানে এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ ঘেরেই মিলছে না কাঙ্ক্ষিত বাগদা।
ক্রমাগত লোকসানের বোঝা বইতে না পেরে স্থানীয় ভুক্তভোগী ঘের মালিক ও সাধারণ মানুষ এখন চিংড়ি ঘের বন্ধ করে জমিতে পুনরায় ধান ও শাকসবজি চাষের সুযোগ চান। সংকট থেকে উত্তরণে তারা সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ এবং শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার শামসুজ্জাহান কনক কাছে জরুরি হস্তক্ষেপ চাই এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কালিঞ্চী গ্রামের প্রায় ২৩০০ বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত এই ঘেরগুলোতে একসময় রেকর্ড পরিমাণ বাগদা চিংড়ি উৎপাদিত হতো। সাতক্ষীরার গণ্ডি পেরিয়ে সারাদেশে এই এলাকার বাগদার বিশেষ খ্যাতি ছিল। তবে গত ৮-১০ বছর ধরে চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে ৭৫ থেকে ৮০ জন ঘের মালিকের কেউই কাঙ্ক্ষিত মাছের দেখা পাচ্ছেন না।
ভুক্তভোগী ঘের মালিক আব্দুল হামিদ গাজী,আব্দুল কুদ্দুস গাইন,আতিয়ার গাইন, হান্নান গাজী ও জাবের ঢালী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দশ বছর আগেও এই কালিঞ্চী গ্রামের ঘেরগুলোতে প্রচুর মাছ হতো। আমাদের পরিবারগুলোতে সচ্ছলতা ছিল। কিন্তু গত এক দশক ধরে উৎপাদন তলানিতে ঠেকায় আমরা সর্বস্বান্ত হতে বসেছি।”
গ্রামের ৭০ বছর বয়সী প্রবীণ বাসিন্দা সুবহান আলী কারিকর অতীতের কথা স্মরণ করে বলেন, “আজ থেকে ৫০ বছর আগে আমরা এই কালিঞ্চীতে নিয়মিত ধান চাষ করতাম। প্রাকৃতিক জলাধারে ইচ্ছামতো মাছ ধরে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতাম। কিন্তু এখন সেই দিন আর নেই। ঘেরে যেহেতু আর মাছ হচ্ছে না, তাই পুনরায় ধান ও শাকসবজি চাষের পরিবেশ ফিরিয়ে দিলে সবাই উপকৃ্ত হবে।”
এদিকে বছরের পর বছর ধরে ঘেরে লোকসান গুনে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। গ্রামবাসীর পক্ষে আনারুল ইসলাম, মান্নান গাজী,নূর আলম, নূর ইসলাম ও আবু হাসান জানান, ঘেরের এই দীর্ঘমেয়াদি মন্দা কাটাতে না পারলে পুরো এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। চিংড়ি ঘেরের পরিবর্তে জমিতে ধান ও রকমারি শাকসবজি চাষের সুযোগ করে দিলে হাজার হাজার মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব হবে।
স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, অধিকাংশ ঘেরের জমির মালিক বহিরাগত বা গ্রামের বাইরের লোক। তারা বাৎসরিক ‘হাঁড়ি’র টাকা নিয়ে চলে যান, কিন্তু বাস্তবে চরম বিপদে পড়েন এলাকার সাধারণ জনগণ ও স্থানীয় প্রান্তিক ঘের মালিকরা। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ধরে চলা এই স্থবিরতা কাটিয়ে দ্রুত কৃষিভিত্তিক সমাধানের জোর দাবি জানিয়েছেন কালিঞ্চীবাসী।