কার ইশারায় চলছে পাটকেলঘাটার সাধু পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ ?
স্টাফ রিপোর্টার :
আইন আছে, নিষেধাজ্ঞা আছে, আছে পরিবেশ রক্ষার কঠোর নির্দেশনা। নিষিদ্ধ পলিথিনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চলছে অভিযান, জরিমানা ও নানা প্রশাসনিক পদক্ষেপ। অথচ সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা থানার শাঁকদহা মোড়ের নির্জন এলাকায় যেন এসব নিয়ম-কানুনের কোনো প্রভাবই নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সেখানে চলছে ‘সাধু পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামে একটি পলিথিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন,প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশগত ছাড়পত্রই যদি না থাকে, তাহলে এতদিন ধরে
কীভাবে চলছে এই উৎপাদন কার্যক্রম ? দেখার কেউ ছিল না, নাকি দেখেও না দেখার ভান ?
কারখানাটিকে ঘিরে স্থানীয়দের অভিযোগের তালিকাও দীর্ঘ। পরিবেশগত ছাড়পত্র, ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন থেকে শুরু করে কাঁচামালের মান, পণ্য বাজারজাত করণ এবং সরকারি রাজস্ব পরিশোধ,প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই উঠেছে প্রশ্ন। আর
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র পরীক্ষা, সরেজমিন তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় নমুনা পরীক্ষা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই তদন্ত হবে কবে ?
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নির্জন এলাকায় কারখানাটি পরিচালিত হলেও বাইরে থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সহজে বোঝার মতো কোনো স্থায়ী ও দৃশ্যমান সাইনবোর্ড নেই। একটি সাধারণ ব্যানারে প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। নিয়মিত উৎপাদন ও বিপণন করা একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, অনুমোদন ও মালিকানা নিয়ে এমন অস্পষ্টতা কেন,এ প্রশ্নও এখন ঘুরছে এলাকাবাসীর মুখে মুখে। কারখানার ব্যানারে প্রোপ্রাইটর হিসেবে ‘লিপিকা রানী সাধু’র নাম উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে। অথচ স্থানীয়দের অভিযোগ, উৎপাদন, বিক্রয় ও দৈনন্দিন কার্যক্রমের মূল নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়া মিলন কুমার সাধু। কাগজে মালিক একজন আর বাস্তবে পরিচালনায় অন্য কেউ,এমন হলে এর পেছনের কারণ কী ? এটি নিছক ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনা, নাকি মালিকানা ও দায় এড়ানোর কোনো কৌশল ? তার উত্তর মিলতে পারে শুধু সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই করলেই। যেমন, ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, ভ্যাট নিবন্ধন, ব্যাংক হিসাব, ক্রয়-বিক্রয় নথি ও অন্যান্য সরকারি কাগজপত্র পর্যালোচনা করলেই পরিষ্কার হতে পারে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিক কে, কে পরিচালনা করছেন এবং কার নামে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
শুধু মালিকানা নয়, কারখানায় ব্যবহৃত কাঁচামাল নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, নির্ধারিত মানের নতুন পলিমার কাঁচামালের পরিবর্তে বিভিন্ন হকারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা কুড়িয়ে পাওয়া পলিথিন ও নিম্নমানের প্লাস্টিক ব্যবহার করে উৎপাদন করা হচ্ছে। অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি শুধু পণ্যের মানের নয়, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। ফলে কাঁচামালের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা এবং ক্রয়ের চালান ও হিসাবপত্র যাচাই করা জরুরি। কারখানাটিকে ঘিরে আরও গুরুতর অভিযোগ,সেখানে উৎপাদিত পলিথিন অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে বাজারজাত করা হচ্ছে। এই অভিযোগ সত্য হলে উৎপাদনের প্রকৃত উৎস আড়াল করার পাশাপাশি ভ্যাট, আয়কর ও ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশেও অনিয়মের প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা জানতে হলে অনুমান নয়, প্রয়োজন উৎপাদন রেজিস্টার, ক্রয়-বিক্রয় হিসাব, চালান, ভ্যাট নথি এবং বাজারজাত করণের কাগজপত্র পরীক্ষা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে কারখানার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত মিলন সাধুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি। বরং বলেন, আপনার এই সমস্ত প্রশ্নের জবাব দিতে আমি বাধ্য নই। ফোন রাখেন, আপনার সঙ্গে কথা বলার মতো কোনো ইচ্ছা আমার নেই। এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ফলে কারখানাটির বৈধতা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, কাঁচামাল এবং অন্যের নামে পণ্য বাজারজাতের অভিযোগ নিয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি এসেছে খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্যে। পরিবেশ অধিদপ্তর, সাতক্ষীরার সহকারী পরিচালক সৌমেন মৈত্র জানিয়েছেন, মিলন সাধুর পলিথিন কারখানার বিষয়ে তাদের কোনো ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। কারখানা পরিচালনার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পর্কেও তার কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই বলে জানান তিনি। তবে সম্প্রতি তিনি ওই কারখানা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন এবং সেখানে খোঁজ খবর নিয়েছেন। ওই সময় মিলন সাধুকে পাওয়া যায়নি। তার ফোন নম্বর না থাকায় যোগাযোগও করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
সৌমেন মৈত্র আরও জানান, আমাদের খুলনার ম্যাজিস্ট্রেট মমতাজ বেগমকে বিষয়টি জানিয়েছি ও সম্প্রতি তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে কারখানাটি নিয়ে একটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসককে মহোদয়কেও অবহিত করা হয়েছে। এখানেই সামনে আসে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি,যদি পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্রই না থাকে, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে একটি পলিথিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কীভাবে সেখানে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে? নিয়মিত নজরদারি ও পরিদর্শনের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এতদিন কী করেছে? কারখানাটি কবে থেকে চলছে, কে অনুমোদন দিয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনের কাছে এর কার্যক্রমের তথ্য ছিল কি না,এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি। কারখানাটির সঙ্গে যুক্ত মিলন সাধুর আর্থিক উত্থান নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ তুলছেন। এদিকে সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি থেকেই যায়,অভিযোগ গুলো যদি সত্য হয়, তাহলে এতদিন ধরে কারখানাটি কীভাবে
চলছে ? আর যদি অভিযোগ সত্য না হয়, তাহলে তদন্ত করে তা স্পষ্ট করা হচ্ছে না কেন ? কারও প্রভাব বা ‘খুঁটির জোরে’ প্রতিষ্ঠানটি চলছে,এমন কথাও স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা মহলকে দায়ী করা যেমন অনুচিত, তেমনি অভিযোগ ওঠার পরও তদন্ত না করে নীরব থাকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারখানাটি নিয়ে শুধু একটি অভিযান কিংবা সাময়িক জরিমানা দিয়ে দায় শেষ করার সুযোগ নেই,এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত কার্যক্রম খতিয়ে দেখা হোক। যাচাই করা হোক পরিবেশগত ছাড়পত্র, ট্রেড লাইসেন্স, প্রকৃত মালিকানা, কাঁচামালের উৎস, উৎপাদন ও বিক্রয়ের হিসাব, পণ্য বাজারজাত করণ এবং ভ্যাট-আয়কর সংক্রান্ত নথি। প্রয়োজনে কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্যের নমুনা পরীক্ষা করা হোক। কারণ পলিথিন শুধু একটি ব্যবসায়িক পণ্য নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা। আর কোনো প্রতিষ্ঠান যদি অনুমোদনহীন ভাবে উৎপাদন করে থাকে, তাহলে সেটি শুধু একটি প্রশাসনিক অনিয়ম নয়,এটি আইনের শাসন ও সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থার প্রতিও প্রশ্ন তুলে দেয়। শাঁকদহা মোড়ের সাধু পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ’কে ঘিরে এখন তাই একাধিক প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। কারখানাটির পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই,পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্যেই যখন এমন তথ্য উঠে এসেছে, তখন পরবর্তী পদক্ষেপ কী ? কারখানার প্রকৃত মালিক কে ? কী কাঁচামাল ব্যবহার হচ্ছে ? কোথায় যাচ্ছে উৎপাদিত পলিথিন ? কার নামে বাজারজাত হচ্ছে ? সরকারি রাজস্ব যথাযথ ভাবে পরিশোধ হচ্ছে কি না ? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন,এতদিন ধরে এই কার্যক্রমের ওপর নজরদারি ছিল কোথায় ? এসব প্রশ্নের উত্তর কোনো গুঞ্জন, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত বক্তব্যে নয়, উত্তর মিলবে সরকারি নথি, মাঠ পর্যায়ের তদন্ত, হিসাবপত্র এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায়। তাই প্রয়োজন লোক দেখানো অভিযান নয়, প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত। কোনো অভিযোগই যেন ফাইলের স্তূপে চাপা পড়ে না থাকে। কারণ শাঁকদহা মোড়ের একটি কারখানাকে ঘিরে ওঠা এই প্রশ্ন গুলো শেষ পর্যন্ত শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়,এ প্রশ্ন প্রশাসনের জবাবদিহি, পরিবেশ রক্ষা, সরকারি রাজস্ব এবং সবার জন্য সমান আইনের শাসনের বলে স্থানীয় অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।